নগদ টাকা গোনা একটি প্রতিদিনের কাজ যা ব্যবসায়ী, ব্যাংক কর্মচারী, দোকানদার এবং সাধারণ মানুষ সবাইকেই করতে হয়। সঠিকভাবে এবং দ্রুত টাকা গোনা শুধু সময় বাঁচায় না, বরং হিসাবে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও কমায়। অনেকে মনে করেন টাকা গোনা একটি সহজ কাজ, কিন্তু প্রফেশনাল পদ্ধতি অনুসরণ করলে এই কাজটি আরও দ্রুত ও নির্ভুল হয়ে ওঠে। এই ব্লগ থেকে টাকা গোনার বিভিন্ন কার্যকর ও সহজ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হ’লঃ-
টাকা গোনার আগে যে সকল বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে
টাকা গোনার আগে সঠিকভাবে স্থান নির্বাচন করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিষ্কার, সমান এবং পর্যাপ্ত আলোকিত স্থান নির্বাচন করতে হবে। কাজের টেবিল বা ডেস্কের উপরিভাগ পরিষ্কার রাখতে হবে যাতে কোনো নোট হারিয়ে না যায় বা অন্য কাগজপত্রের সাথে মিশে না যায়। হাত শুষ্ক এবং পরিষ্কার রাখা জরুরি কারণ ভেজা বা তৈলাক্ত হাতে নোট আটকে যায় এবং গোনায় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
টাকা গোনার জন্য মানসিকভাবেও প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। তাড়াহুড়ো না করে স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করতে হবে। যদি বেশি পরিমাণের টাকা গুনতে হয়, তাহলে একটি নোটবুক বা ক্যালকুলেটর হাতের কাছে রাখতে হবে।
ম্যানুয়ালি টাকা গোনার পদ্ধতি
ট্রাডিশনাল পদ্ধতি
সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতি হলো প্রতিটি নোট আলাদা করে গণনা করা হয়। এই পদ্ধতিতে বাম হাতে নোটের বান্ডিল রেখে ডান হাত দিয়ে একটি একটি করে নোট টেনে নিয়ে গণনা করুন। প্রতিটি নোট গোনার সময় মুখে বা মনে মনে সংখ্যা মনে রাখার চেষ্টা করুন। এই পদ্ধতি শুধুমাত্র ছোট অঙ্কের টাকার জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে কিন্তু বেশি পরিমাণ টাকা গণনার জন্য নয়।
ফ্যান পদ্ধতি
প্রফেশনাল ক্যাশিয়াররা প্রায়ই এই পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। সাধারণত নোটগুলো একটি হাতে ধরে বৃদ্ধাঙ্গুলির সাহায্যে একটু একটু করে ছড়িয়ে নিতে হবে,, যাতে একটি ফ্যানের মতো আকৃতি তৈরি হয়। এতে দ্রুত নোটের সংখ্যা অনুমান করা যায় এবং কোনো নোট আটকে আছে কিনা তা বোঝা যায়। প্রথমে এই পদ্ধতি কঠিন মনে হলেও নিয়মিত অনুশীলনে দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব।
গুণিতক পদ্ধতি
এই পদ্ধতিতে পাঁচটি বা দশটি নোট একসাথে আলাদা করে ছোট ছোট বান্ডিল তৈরি করে নিতে হয়। প্রতি পাঁচটি বা দশটি নোট আলাদা করার পর সেগুলো ৯০ ডিগ্রি কোণে রাখতে হবে যাতে পরে সহজে গণনা করা যায়। শেষে প্রতিটি বান্ডিলে পাঁচটি বা দশটি করে নোট আছে জেনে মোট সংখ্যা গুণ করে বের করা যায়। এই পদ্ধতি দ্রুত হিসেব করা যায় এবং ভুলের সম্ভাবনা কম হয়।
স্ট্যাকিং পদ্ধতি
স্ট্যাকিং পদ্ধতিতে দশটি নোট একসাথে বান্ডেল করে আলাদা করে রাখতে হয়। প্রতিটি বান্ডেলে ঠিক দশটি করে নোট রাখার পর পরবর্তী বান্ডেল শুরু করতে হয়। সব শেষে বান্ডেলের সংখ্যাকে দশ দিয়ে গুণ করলে মোট নোটের সংখ্যা পাওয়া যাবে। এই পদ্ধতি শুধুমাত্র একই মূল্যমানের নোট গোনার সময় ব্যবহার করা যাবে।
মূল্যমান অনুযায়ী সাজানো
যদিও বিভিন্ন মূল্যমানের নোট মিশিয়ে গোনা অত্যন্ত ঝামেলার এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে টাকা গোনার আগে সবসময় মূল্যমান অনুযায়ী আলাদা করে নিতে হবে। ১০০০ টাকার নোট এক স্তূপে, ৫০০ টাকার নোট আরেক স্তূপে, এভাবে সাজিয়ে নিতে হবে। এতে গোনা সহজ হয় এবং মোট টাকা হিসাব করতে সুবিধা হয়।
প্রতিটি মূল্যমানের নোট গোনার পর তা রাবার ব্যান্ড বা পেপার ক্লিপ দিয়ে আলাদা করে রাখতে হবে এবং একটি কাগজে লিখে রাখুন কত টাকার কতটি নোট আছে। উদাহরণস্বরূপ: “১০০০ টাকা × ২৫ নোট = ২৫,০০০ টাকা”। এভাবে প্রতিটি মূল্যমান লিখে রাখলে পরে মোট টাকা যোগ করা সহজ হয়।
পুরনো ও নতুন নোট আলাদা করা
পুরনো নোট এবং নতুন, ঝকঝকে নোট একসাথে গোনা কঠিন কারণ পুরনো নোট প্রায়ই একসাথে আটকে যায়। তাই প্রথমে পুরনো এবং নতুন নোট আলাদা করে নিন। পুরনো নোট গোনার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে কারণ দুটি নোট একসাথে আটকে থাকতে পারে।
পুরনো নোট গোনার আগে হালকা করে নাড়ানো বা ফ্যান করে দেখা ভালো যাতে আটকানো নোট আলাদা হয়। প্রয়োজনে প্রতিটি নোট আলাদাভাবে যাচাই করুন। নতুন নোট গোনা তুলনামূলকভাবে সহজ কারণ সেগুলো সাধারণত আটকে থাকে না।
দ্রুত টাকা গোনার সঠিক কৌশল
থাম্ব কাউন্ট পদ্ধতি
এই পদ্ধতিতে বৃদ্ধাঙ্গুলির সাহায্যে দ্রুত নোট গোনা হয়। বাম হাতে নোটের বান্ডিল ধরুন এবং ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে একটি একটি করে নোট সরিয়ে ডান হাতে নিয়ে নিন। এই পদ্ধতিতে অনুশীলনের মাধ্যমে প্রতি মিনিটে ১০০-১৫০ টি নোট গোনা সম্ভব।
ডবল কাউন্ট পদ্ধতি
নিরাপত্তার জন্য বড় অঙ্কের টাকা দুইবার গোনা উচিত। প্রথমবার স্বাভাবিকভাবে গোনার পর নোটগুলো উল্টে দিয়ে আবার গুনে নিতে হবে । দুইবারের ফলাফল মিলে গেলে বুঝবেন গণনা সঠিক হয়েছে। এই পদ্ধতি ব্যাংক এবং বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক।
ব্যাচ কাউন্টিং
একসাথে অনেক টাকা গুনতে হলে ছোট ছোট ব্যাচে ভাগ করে নিন। প্রতিটি ব্যাচে ৫০ বা ১০০ টি নোট রাখুন এবং প্রতিটি ব্যাচ আলাদাভাবে গুনে নিশ্চিত করুন। সব ব্যাচ গোনা শেষ হলে মোট ব্যাচের সংখ্যা দিয়ে গুণ করুন।
আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য
নোট কাউন্টিং মেশিন
বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের অটোমেটিক নোট গোনার মেশিন পাওয়া যায় যা প্রতি মিনিটে ১০০০-১৫০০ নোট গুনতে পারে। এই মেশিনগুলো শুধু নোট গোনেই না, বরং জাল নোট সনাক্তকরণ, বিভিন্ন মূল্যমানের নোট আলাদা করা এবং মোট টাকার পরিমাণ হিসাব করার সুবিধাও দেয়।
ছোট ব্যবসার জন্য সাধারণ পোর্টেবল কাউন্টার মেশিন ১৫,০০০ টাকায় পাওয়া যায়। বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্নত মানের মেশিন যা মাল্টি-কারেন্সি, মাল্টি-ডিনোমিনেশন সাপোর্ট করে, সেগুলোর দাম ৫০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বর্তমান বাজারে কিংটন প্লাস ব্র্যান্ডের মানি কাউন্টিং মেশিন পাওয়া যায় অল্প টাকার মধ্যে। ঈগল ট্রেড বিডি এর একমাত্র অথরাইজড ডিস্ট্রিবিউটর।
টাকা গোনায় সাধারণ ভুল এবং তা এড়ানোর উপায়
অনেকে টাকা গোনার সময় মনোযোগ হারিয়ে যেতে পারে এবং কোথায় থামলেন তা ভুলে যান। এই সমস্যা এড়াতে প্রতি ২৫ বা ৫০ নোট পর একটু বিরতি নিয়ে সংখ্যা নোট করে রাখুন। টাকা গোনার মাঝে কেউ কথা বললে বা বিঘ্ন ঘটলে আবার শুরু থেকে গুনুন।
আরেকটি সাধারণ ভুল হলো দুটি নোট একসাথে গোনা বা একটি নোট দুইবার গোনা। এটি এড়াতে প্রতিটি নোট স্পষ্টভাবে আলাদা করে গুনুন এবং গোনা নোটগুলো সম্পূর্ণ আলাদা স্তূপে রাখুন।
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য টাকা গোনার রুটিন
দোকান বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে দিনের শুরুতে এবং শেষে টাকা গোনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকালে কাজ শুরুর আগে ক্যাশ রেজিস্টারে কত টাকা আছে তা গুনে নোট করুন। দিন শেষে আবার গুনে দেখুন এবং দিনের বিক্রয়ের সাথে মিলিয়ে নিন। এভাবে প্রতিদিনের হিসাব সংরক্ষণ করলে আর্থিক ব্যবস্থাপনা সহজ হয়।
বড় লেনদেনের পর তাৎক্ষণিক টাকা গুনে নিন এবং গ্রাহকের সামনেই যাচাই করুন। এতে পরবর্তীতে বিরোধের সম্ভাবনা কমে। টাকা জমা বা তোলার সময়ও দুই পক্ষই গুনে নিশ্চিত হন।
টাকা সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা
টাকা গোনার পর সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। মূল্যমান অনুযায়ী আলাদা করে রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে রাখুন। প্রতিটি বান্ডিলে একটি কাগজের স্লিপ দিয়ে লিখে রাখুন কত টাকার কতটি নোট আছে। বড় অঙ্কের টাকা নিরাপদ স্থানে যেমন ক্যাশ বক্স বা সেফে রাখুন।
দীর্ঘ সময়ের জন্য টাকা রাখলে পুরনো নোট আলাদা করুন এবং ব্যাংকে জমা দিয়ে নতুন নোট নিয়ে আসুন। এতে পরবর্তী সময়ে গোনা সহজ হয় এবং গ্রাহকদেরও ভালো মানের নোট দিতে পারবেন।
উপসংহার
টাকা গোনা একটি দক্ষতা যা নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে উন্নত করা যায়। সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ, পর্যাপ্ত মনোযোগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই কাজ দ্রুত, নির্ভুল এবং সহজ হয়ে ওঠে। ছোট ব্যবসা হোক বা বড় প্রতিষ্ঠান, কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজন—সবার জন্যই দক্ষভাবে টাকা গোনার ক্ষমতা অত্যন্ত মূল্যবান। মনে রাখবেন, ধৈর্য এবং অনুশীলন সফলতার চাবিকাঠি।

Add comment